আধুনিক পদ্ধতিতে কলা চাষ পদ্ধতি-
আধুনিক পদ্ধতিতে কলা চাষ পদ্ধতি।
কলা চাষ :
বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যেসব জাতের আবাদ হচ্ছে তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতগুলো হচ্ছে বারিকলা-১ ও বারিকলা-২ (আনাজিকলা), অমৃতসাগর, সবরি, চম্পা, কবরি, মেহেরসাগর, বীচিকলা অন্যতম।
মাটি :
পর্যাপ্ত রোদযুক্ত ও পানি নিকাশের সুবিধাযুক্ত উঁচু জমি কলা চাষের জন্য উপযুক্ত। উর্বর দো-আঁশ মাটি কলা চাষের জন্য উত্তম। চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল ও আগাছামুক্ত করে নিতে হবে।
চারা সংগ্রহ ও রোপণ:
বেশী পুরানো বাগান হতে চারা সংগ্রহ না করা উত্তম। পুরানো বাগানের কন্দ উইভিল পোকাক্রান্ত হতে পারে। গর্তে সার প্রয়োগের পর চারা রোপণ করতে হয়। সোর্ড সাকার/তরবারি চারা রোপণ করাই উত্তম। প্রতি হেক্টরে ২ x ২ মিটার দূরত্বে ২৫০০টি, ১.৮ x ১.৮ মি. দূরত্বে ৩০৮৬টি ও ১.৫ x ১.৫ মি. দূরত্বে ৪৪৪০টি সাকারের প্রয়োজন হয়।
রোপণ সময়:
কলার চারা বছরে ৩ মৌসুমেই রোপণ করা যায়। মধ্য জানুয়ারী থেকে মধ্য মার্চ। মধ্য মার্চ থেকে মধ্য মে এবং মধ্য সেপ্টেম্বর থেকে মধ্য নভেম্বর।
চারার দূরত্ব : সারি থেকে সারির দূরত্ব ২ মিটার এবং চারা থেকে চারার দূরত্ব ২ মিটার।
গর্ত তৈরি :
চারা রোপণের মাসখানেক আগেই গর্ত খনন করতে হবে। গর্তের আকার হবে ৬০ সেমি. চওড়া ও ৬০ সেমি. গভীর। গর্ত তৈরি হয়ে গেলে গোবর ও টিএসপি সার মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরে রাখতে হবে।
চারা রোপণ :
রোপণের জন্য অসি তেউড় উত্তম। অসি তেউরের পাতা সরু, সুঁচালো এবং অনেকটা তলোয়ারের মতো, গুড়ি বড় ও শক্তিশালী এবং কা- ক্রমশ গোড়া থেকে ওপরের দিকে সরু হয়। তিন মাস বয়স্ক সুস্থ সবল তেউড় রোগমুক্ত গাছ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
সার ও সার প্রয়োগ পদ্ধতি:
সারের নাম প্রতি গাছে সারের পরিমাণ
গোবর-আবর্জনা সার ১৫-২০ কেজি
টিএসপি ২৫০-৪০০ গ্রাম
এমপি ২৫০-৩০০ গ্রাম
ইউরিয়া ৫০০-৬৫০ গ্রাম
অর্ধেক গোবর জমি তৈরির সময় এবং অবশিষ্ট অর্ধেক গর্তে দিতে হবে। অর্ধেক টিএসপি একই সঙ্গে গর্তে প্রয়োগ করতে হবে। রোপণের দেড় থেকে দুই মাস পর ৪ ভাগের ১ ভাগ ইউরিয়া, অর্ধেক এমপি ও বাকি টিএসপি জমিতে ছিটিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। এর দুই থেকে আড়াই মাস পর গাছ প্রতি বাকি অর্ধেক এমপি ও অর্ধেক ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে। মোচা বের হওয়ার সময় অবশিষ্ট ৪ ভাগের ১ ভাগ ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।
কলা গাছের পরিচর্যা :
চারা রোপণের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে তখনই সেচ দেয়া উচিত। এছাড়া শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পর পর সেচ দেয়া দরকার। বর্ষার সময় কলা বাগানে যাতে পানি জমতে না পারে তার জন্য নালা থাকা আব্যশক। মোচা আসার পর গাছপ্রতি মাত্র একটি তেউড় বাড়তে দেয়া ভালো।
অর্ন্তবর্তীকালীন পরিচর্যা :
সেচ:
শুকনো মৌসুমে ১৫-২০ দিন পরপর সেচের প্রয়োজন হয়। গাছ বৃদ্ধির প্রথম অবস্থায় বিশেষ করে রোপণের প্রথম চারমাস কলা বাগান আগাছা মুক্ত রাখা খুব জরুরী । কলা বাগানের জমিতে যাতে পানি না জমে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার। প্রয়োজন হলে পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা কেটে দিতে হবে ।
আন্তঃফসল:
চারা রোপণের প্রথম ৪-৫ মাস বলতে গেলে জমি ফাকাই থাকে। যদি সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে চারা রোপণ করা হয় তবে কলা বাগানের মধ্যে আন্তঃফসল হিসাবে রবি মৌসুমের সবজি চাষ করা যেতে পারে। তবে এসব আন্তঃফসলের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত সার দিতে হবে। জানুয়ারী-ফেব্রুয়ারী (মাঘ) মাসে চারা রোপণ করলেও আন্তঃফসল হিসাবে কুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা ইত্যাদি বাড়তি ফসল উৎপাদন করা যায়।
ফলের যত্ন:
গাছে থোড় আসার পরপরই গাছ যাতে বাতাসে ভেঙ্গে না যায় সেজন্য বাঁশের খুঁটি দিয়ে বাতাসের বিপরীত দিক থেকে গাছে ঠেস দেয়া খুবই জরুরী। থোড় থেকে কলা বের হওয়ার আগেই গোটা থোড় স্বচ্ছ বা সবুজ পলি ব্যাগ দিয়ে ঢেকে দেয়া দরকার। পলি ব্যাগের নীচের দিকের মুখ একটু খোলা রাখতে হবে।
মুড়ি ফসল:
চারা রোপণের প্রথম ৪-৫ মাস পর সাকার (ফেকড়ি) বের হওয়া শুরু করে। কলাগাছে থোড় বের হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ১৫ দিন পরপর মাটির ৫ সে.মি. উপরে ধারালো হাসুয়া দিয়ে সবগুলো চারা কেটে ফেলে দিতে হবে। থোড়া বা ফুল বের হবার পর পছন্দমত জায়গায় কোন একটি চারাকে বাড়তে দেয়া উচিত যেটি মুড়ি ফসল হিসেবে পরবর্তীতে বেড়ে উঠবে ও ফল দিবে। মুড়ি ফসলের জন্য সমান বয়সের চারা নির্বাচন করতে হবে।
পোকামাকড় দমন:
কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা:
কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা দিনের বেলা পাতার গোড়ায় লুকিয়ে থাকে এবং রাত্রে বের হয়ে কচি পাতার সবুজ অংশের রস চুষে খায়। ফলে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ঢুকে কচি কলার রস চুষে খায়। ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের দাগের মত দাগ হয়। এ পোকা দমনে নিন্মলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
ক) পোকা আক্রা্ন মাঠে বার বার কলা চাষ না করা।
খ) কলার মোচা বের হওয়ার সময় পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে এ পোকার আক্রামন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
গ) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি অথবা ম্যালাথিয়ন অথবা লিবাডিস ৫০ ইসি ২ মি.লি. মিশিয়ে ১৫ দিন পরপর গাছের পাতার গোড়ায় ছিটাতে হবে।
রোগ ও প্রতিকার:
পানামা রোগ:
এটি একটি ছত্রাক জাতীয় মারাত্নক রোগ। এ রোগের আক্রমণে প্রথম বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে যায় এবং পরে কচি পাতাও হলুদ রঙ ধারণ করে। পরবতীতে পাতা বোটার কাছে ভেঙ্গে গাছের চতুর্দিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অবশেষে গাছ মরে যায়। কোন কোন সময় গাছ লম্বালম্বি ভাবে ফেটেও যায়। এ রোগ দমনে নিন্মলিখিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
ক) আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
খ) আক্রান্ত গাছের সাকার চারা হিসেবে ব্যবহার না করা।
গ) পানামা রোগ প্রতিরোধকারী চাম্পা জাত ব্যবহার করা।
বানচি-টপ ভাইরাস রোগ:
এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা গুচ্ছাকারে বের হয়। পাতা আকারে খাটো, অপ্রশস্থ এবং উপরের দিকে খাড়া থাকে। কচি পাতার কিনারা উপরের দিকে বাঁকানো এবং সামান্য হলুদ রঙয়ের হয়। অনেক সময় পাতার মধ্য শিরা ও বোটায় ঘন সবুজ দাগ দেখা যায়। এ রোগে আক্রান্ত গাছে কোন সময় মোঁচা আসেনা। নিন্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমন করা যায়।
ক) ভাইরাস বহনকারী এফিড পোকা দমনে রগর বা সুমিথিন (২ মি.লি./লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করা যেতে পারে।)
খ) আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
গ) বানচি-টপ রোগ প্রতিরোধকারী চাম্পা জাত ব্যবহার করা।
সিগাটোকা রোগ:
এ রোগের আক্রমণে প্রাথমিকভাবে ৩য় বা ৪র্থ পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়। ক্রমশ দাগগুলো বড় হয় ও বাদামি রং ধারণ করে। এভাবে একাধিক দাগ বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং তখন পাতা পুড়ে যাওয়ার মত দেখায়। নিন্মোক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগ দমনে রাখা হবে।
ক) আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
খ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি টিল্ট-২৫০ ইসি অথবা ১ গ্রাম ব্যাভিস্টিন মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর গাছে ছিটাতে হবে।
ফসল সংগ্রহ :
কলার চারা রোপণের ১১-১৫ মাসের মধ্যেই সাধারণত সব জাতের কলা পাকার উপযুক্ত হয়। প্রতি হেক্টরে ১২-১৫ টন কলার ফলন পাওয়া যাবে।

0 Comments: